শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২, বিকাল ৫:৪৮
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২,বিকাল ৫:৪৮

ডেঙ্গুর ভয়াবহ রুপ

সন্তোষ দাস

২১ নভেম্বর, ২০২২,

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp

৩:৪৫ pm

করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার ডেঙ্গু আতঙ্ক গ্রাস করেছে দেশটাকে। ছোট্ট একটি প্রাণী মশা। সেটা যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে কামড়াতে পারে। আর মশাটি যদি হয় স্ত্রী জাতীয় এডিস মশা যা ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে, তাহলে ওই মশা দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গু জ্বর হলো স্ত্রী জাতীয় এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় একটি রোগ। ৩৫০ উত্তর ও ৩৫০ দক্ষিণ অক্ষাংশের দেশগুলি গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের অন্তর্গত।

ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে- জ্বর, মাথা ব্যথা, বমি, পেশিতে ও গাঁয়ে ব্যথা ও চামড়ায় ফুসকড়ি ইত্যাদি। কয়েক প্রকার ডেঙ্গু জ্বরের মধ্যে হেমোরেজিক ফিভার মারাত্মক। এতে রক্তপাত হয়, রক্তে অনুচক্রিকার মাত্রা কমে যায় এবং প্লাজমার নিঃসরণ ঘটে। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুর চারটি ভ্যারাইটি নিহ্নিত হয়েছে। এগুলো হলো- ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। এদের মধ্যে ডেন-৪ এবছরই আবিস্কৃত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন ডেন-১, ডেন-৩ এবং ডেন-৪ সক্রিয়। ১৭৭৯ সালে ডেঙ্গুর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। বিংশ শতকের প্রথমভাগে ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎস ও সংক্রমণ সম্বন্ধে বিশদ জানা যায় (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া)।

সাধারণতঃ বদ্ধ ও স্বচ্ছ জলাশয় এডিস মশার বংশ বিস্তারের উপযুক্ত স্থান। তাই বর্ষাকাল বিশেষ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব হয়ে থাকে। তবে এ বছর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এমনকি এই মধ্য নভেম্বরে যখন শীত পড়ে গেছে তখনও ডেঙ্গুর দাপটে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। বিশেজ্ঞদের ধারণা, জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবে দেরিতে বৃষ্টি হওয়ার জন্যই এমনটি হচ্ছে।

তবে কথা হলো, এবার ডেঙ্গু যে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। গত কিছুদিন যাবৎ গড়ে প্রতিদিন পাঁচ জন করে মারা যাচ্ছে এবং সাতশ থেকে আটশ জন আক্রান্ত হচ্ছে। আর এটা কমার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ২২০ জন মৃত্যুবরণ করেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ৫১৬০২ জন (১৯ নভেম্বর ২০২২ তারিখ পর্যন্ত)।

মাস্ক পরে, হাত ধুয়ে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ও ঘরে বসে থেকে করোনাভাইরাস থেকে রেহাই পাওয়া যায়। কিন্তু মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া মুশকিল। বাড়ির চারিদিক পরিস্কার রেখে, কোথাও পানি জমতে না দিয়ে, মশারি টানিয়ে বা মশার কয়েল জ্বালিয়ে এর বিস্তার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু সর্বক্ষণ মশার কামড় থেকে নিরাপদ থাকা যাবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। মানুষ তার নিজ বাসা বা বাড়িতে হয়ত সুরক্ষিত থাকতে পারে। কিন্তু তাকে তো কার্যোপলক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। সেই জায়গাগুলি সুরক্ষিত নাও হতে পারে। আর এই মুহূর্তে কোনো জায়গায়ই সুরক্ষিত নয়!

সাম্প্রতিক খবরে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এটা অবশ্যই উদ্বেগজনক খবর। মানুষকে সর্বক্ষণ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে হচ্ছে।

ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে গণসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বাড়ির আঙ্গিনা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, মশারির মধ্যে শোয়া, সকাল-সন্ধ্যা যে সময় এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে সে সময় মশা প্রতিরোধক কয়েল জ্বালানো ইত্যাদি কাজগুলো করতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনকে। মশার উৎস ধ্বংস করতে বা নিয়মিত মশা নিরোধক ওষুধ ছিটাতে তাদের আরো তৎপর হতে হবে। আর এ সকল কর্মতৎপরতা প্রায় সারা বছর ধরেই চালাতে হবে। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এডিস মশার হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

লেখক : সন্তোষ দাস
প্রভাষক, সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা ডিগ্রি কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com

Related Posts

ডেঙ্গুর ভয়াবহ রুপ

সন্তোষ দাস

২১ নভেম্বর, ২০২২,

৩:৪৫ pm

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp

করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার ডেঙ্গু আতঙ্ক গ্রাস করেছে দেশটাকে। ছোট্ট একটি প্রাণী মশা। সেটা যেকোনো সময় যেকোনো মানুষকে কামড়াতে পারে। আর মশাটি যদি হয় স্ত্রী জাতীয় এডিস মশা যা ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে, তাহলে ওই মশা দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গু জ্বর হলো স্ত্রী জাতীয় এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত গ্রীষ্মমন্ডলীয় একটি রোগ। ৩৫০ উত্তর ও ৩৫০ দক্ষিণ অক্ষাংশের দেশগুলি গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের অন্তর্গত।

ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে- জ্বর, মাথা ব্যথা, বমি, পেশিতে ও গাঁয়ে ব্যথা ও চামড়ায় ফুসকড়ি ইত্যাদি। কয়েক প্রকার ডেঙ্গু জ্বরের মধ্যে হেমোরেজিক ফিভার মারাত্মক। এতে রক্তপাত হয়, রক্তে অনুচক্রিকার মাত্রা কমে যায় এবং প্লাজমার নিঃসরণ ঘটে। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুর চারটি ভ্যারাইটি নিহ্নিত হয়েছে। এগুলো হলো- ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। এদের মধ্যে ডেন-৪ এবছরই আবিস্কৃত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখন ডেন-১, ডেন-৩ এবং ডেন-৪ সক্রিয়। ১৭৭৯ সালে ডেঙ্গুর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। বিংশ শতকের প্রথমভাগে ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎস ও সংক্রমণ সম্বন্ধে বিশদ জানা যায় (সূত্রঃ উইকিপিডিয়া)।

সাধারণতঃ বদ্ধ ও স্বচ্ছ জলাশয় এডিস মশার বংশ বিস্তারের উপযুক্ত স্থান। তাই বর্ষাকাল বিশেষ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব হয়ে থাকে। তবে এ বছর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এমনকি এই মধ্য নভেম্বরে যখন শীত পড়ে গেছে তখনও ডেঙ্গুর দাপটে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। বিশেজ্ঞদের ধারণা, জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবে দেরিতে বৃষ্টি হওয়ার জন্যই এমনটি হচ্ছে।

তবে কথা হলো, এবার ডেঙ্গু যে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। গত কিছুদিন যাবৎ গড়ে প্রতিদিন পাঁচ জন করে মারা যাচ্ছে এবং সাতশ থেকে আটশ জন আক্রান্ত হচ্ছে। আর এটা কমার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ২২০ জন মৃত্যুবরণ করেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ৫১৬০২ জন (১৯ নভেম্বর ২০২২ তারিখ পর্যন্ত)।

মাস্ক পরে, হাত ধুয়ে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ও ঘরে বসে থেকে করোনাভাইরাস থেকে রেহাই পাওয়া যায়। কিন্তু মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া মুশকিল। বাড়ির চারিদিক পরিস্কার রেখে, কোথাও পানি জমতে না দিয়ে, মশারি টানিয়ে বা মশার কয়েল জ্বালিয়ে এর বিস্তার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু সর্বক্ষণ মশার কামড় থেকে নিরাপদ থাকা যাবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। মানুষ তার নিজ বাসা বা বাড়িতে হয়ত সুরক্ষিত থাকতে পারে। কিন্তু তাকে তো কার্যোপলক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। সেই জায়গাগুলি সুরক্ষিত নাও হতে পারে। আর এই মুহূর্তে কোনো জায়গায়ই সুরক্ষিত নয়!

সাম্প্রতিক খবরে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এটা অবশ্যই উদ্বেগজনক খবর। মানুষকে সর্বক্ষণ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে হচ্ছে।

ডেঙ্গুর এই ভয়াবহ বিস্তার রোধে গণসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বাড়ির আঙ্গিনা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, মশারির মধ্যে শোয়া, সকাল-সন্ধ্যা যে সময় এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে সে সময় মশা প্রতিরোধক কয়েল জ্বালানো ইত্যাদি কাজগুলো করতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনকে। মশার উৎস ধ্বংস করতে বা নিয়মিত মশা নিরোধক ওষুধ ছিটাতে তাদের আরো তৎপর হতে হবে। আর এ সকল কর্মতৎপরতা প্রায় সারা বছর ধরেই চালাতে হবে। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এডিস মশার হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

লেখক : সন্তোষ দাস
প্রভাষক, সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা ডিগ্রি কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com

Related Posts