শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২, সন্ধ্যা ৭:২২
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২২,সন্ধ্যা ৭:২২

মার খেয়ে মার চুরি করা

সন্তোষ দাস

১৫ জুলাই, ২০২২,

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp

৩:৫৩ pm

দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবর অনুযায়ী রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজা স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী কর্তৃক প্রহৃত হয়েছেন। এখন সাংসদ এবং অধ্যক্ষ দু’জনই ঘটনা অস্বীকার করছেন। বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেও ঘটনা অস্বীকার করে একে নিছক এমপি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন। এমপি মহোদয় অস্বীকার করবেন এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ যিনি অন্যায় করেন তিনি সহজে তার অন্যায় স্বীকার করবেন এমন সংস্কৃতি আমাদের দেশে বিরল। কিন্তু অধ্যক্ষ কেন অস্বীকার করলেন?

বিভিন্ন খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘটনা একটা ঘটেছে। অধ্যক্ষের গায়ে মুখে আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে। তাহলে তার অস্বীকার করার পিছনের কারণটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি আসলে ভয় পেয়েছেন বা তাকে ভয় দেখানো হয়েছে। তিনি আরো অপমানিত হতে চান না বা চাকরি হারাতে চান না। এক কথায়, জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করার সাহস, ক্ষমতা ও মনোবল কোনটাই নেই তার। তাই তিনি মার খেয়ে মার চুরি করেছেন।

ধরে নেওয়া যাক ওই অধ্যক্ষ এমন কিছু অন্যায় করেছেন যাতে এমপি মহোদয় বাধ্য হয়েছেন তাকে প্রহার করতে। কিন্তু এমপিতো একজন আইন প্রণেতা। তিনি নিজ হাতে আইন ভাঙতে পারেন? মূলতঃ কেউ আইন নিজ হাতে তুলে নিতে পারেন না। আর একজন এমপিতো আইনের রক্ষক। এখানে ল মেকার ইজ ল ব্রেকার।

বিগত কিছুদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষকরা অপদস্ত হয়ে চলেছেন। নড়াইলে একজন অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানো হলো, ঢাকায় একজন শিক্ষক তার ছাত্রের হাতে নিহত হলেন। কয়েক বছর আগে নারায়নগঞ্জে শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানো হলো। এমনিতে বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কম, তারপর সম্মানটুকুও যদি না থাকে তবে এ পেশায় মেধাবী ছেলে-মেয়েরা আসবে কেন?

শিক্ষকদের মর্যাদা এখন আর নেই। অতিতেও তাদের আর্থিক সুবিধা কম ছিল। কিন্তু মর্যাদাটুকু অন্ততঃ ছিল। আমরা আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি সমাজে শিক্ষকদের একটা আলাদা সম্মান ছিল। সেই প্রাচীনকালের রাজা বাদশারাও শিক্ষকদের উচুঁ আসনে বসিয়েছিলেন। ছোট বেলায় পড়া একটি কবিতার শেষ চরণ দুটি এমন-

‘‘আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির
সত্যিই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।’’

কবিতায় বলা হয়েছে, একদিন প্রভাতে দিল্লীর বাদশাহ দেখলেন তার পুত্র কুমার তার শিক্ষাগুরুর পায়ে পানি ঢালছে আর শিক্ষক নিজ হাতে পা ধুচ্ছেন। বাদশা শিক্ষককে ডেকে পাঠালেন তার দরবারে। শিক্ষক ভাবলেন, যেহেতু তিনি তার পুত্র রাজকুমারকে দিয়ে পানি ঢালিয়েছেন তাই বাদশা তাকে শাস্তি দেবেন। কিন্তু বাদশা তাকে বললেন, তিনি তার পুত্রকে প্রকৃত শিক্ষা দিতে পারেননি। প্রকৃত শিক্ষা দিলে আজ তার পুত্র শুধু পানি ঢেলে দিত না, নিজ হাতে গুরুর পা ধুয়ে দিত। শিক্ষক বাদশাহর কথা শুনে আপ্লুত হলেন।

আগেকার দিনে এমনিভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমাজের সর্বত্র শিক্ষকদের মর্যাদা দেওয়া হত। এখন সেটা একবারেই নেই। এজন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও হয়ত কিছুটা দায়ী। কিছু কিছু শিক্ষক ক্লাসে পড়ানো ফাঁকি দিয়ে টিউশনিসহ ব্যাচ কোচিং করান। কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অনৈতিক কাজে জড়িত। অর্থনৈতিক বা সামাজিক নানা কারণে শিক্ষকদের এই অধঃপতন। তবে গুটি কয়েক শিক্ষকের জন্য আজ পুরো শিক্ষক সমাজ মর্যাদাহীন হয়ে পড়েছেন। চারিদিকে যা ঘটছে তা দেখে একজন শিক্ষক হিসেবে আমিও লজ্জিত ও ব্যথিত। জানিনা কিভাবে আবার শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার হবে। কিভাবে আবার রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র তাদের সম্মানের চোখে দেখা হবে। তবে যেভাবেই হোক শিক্ষকের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার উপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

লেখক : সন্তোষ দাস
প্রভাষক, সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা ডিগ্রি কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com

Related Posts

মার খেয়ে মার চুরি করা

সন্তোষ দাস

১৫ জুলাই, ২০২২,

৩:৫৩ pm

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp

দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবর অনুযায়ী রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম রেজা স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী কর্তৃক প্রহৃত হয়েছেন। এখন সাংসদ এবং অধ্যক্ষ দু’জনই ঘটনা অস্বীকার করছেন। বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) তারা যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেও ঘটনা অস্বীকার করে একে নিছক এমপি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন। এমপি মহোদয় অস্বীকার করবেন এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ যিনি অন্যায় করেন তিনি সহজে তার অন্যায় স্বীকার করবেন এমন সংস্কৃতি আমাদের দেশে বিরল। কিন্তু অধ্যক্ষ কেন অস্বীকার করলেন?

বিভিন্ন খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঘটনা একটা ঘটেছে। অধ্যক্ষের গায়ে মুখে আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে। তাহলে তার অস্বীকার করার পিছনের কারণটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তিনি আসলে ভয় পেয়েছেন বা তাকে ভয় দেখানো হয়েছে। তিনি আরো অপমানিত হতে চান না বা চাকরি হারাতে চান না। এক কথায়, জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করার সাহস, ক্ষমতা ও মনোবল কোনটাই নেই তার। তাই তিনি মার খেয়ে মার চুরি করেছেন।

ধরে নেওয়া যাক ওই অধ্যক্ষ এমন কিছু অন্যায় করেছেন যাতে এমপি মহোদয় বাধ্য হয়েছেন তাকে প্রহার করতে। কিন্তু এমপিতো একজন আইন প্রণেতা। তিনি নিজ হাতে আইন ভাঙতে পারেন? মূলতঃ কেউ আইন নিজ হাতে তুলে নিতে পারেন না। আর একজন এমপিতো আইনের রক্ষক। এখানে ল মেকার ইজ ল ব্রেকার।

বিগত কিছুদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষকরা অপদস্ত হয়ে চলেছেন। নড়াইলে একজন অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানো হলো, ঢাকায় একজন শিক্ষক তার ছাত্রের হাতে নিহত হলেন। কয়েক বছর আগে নারায়নগঞ্জে শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানো হলো। এমনিতে বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কম, তারপর সম্মানটুকুও যদি না থাকে তবে এ পেশায় মেধাবী ছেলে-মেয়েরা আসবে কেন?

শিক্ষকদের মর্যাদা এখন আর নেই। অতিতেও তাদের আর্থিক সুবিধা কম ছিল। কিন্তু মর্যাদাটুকু অন্ততঃ ছিল। আমরা আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি সমাজে শিক্ষকদের একটা আলাদা সম্মান ছিল। সেই প্রাচীনকালের রাজা বাদশারাও শিক্ষকদের উচুঁ আসনে বসিয়েছিলেন। ছোট বেলায় পড়া একটি কবিতার শেষ চরণ দুটি এমন-

‘‘আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির
সত্যিই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।’’

কবিতায় বলা হয়েছে, একদিন প্রভাতে দিল্লীর বাদশাহ দেখলেন তার পুত্র কুমার তার শিক্ষাগুরুর পায়ে পানি ঢালছে আর শিক্ষক নিজ হাতে পা ধুচ্ছেন। বাদশা শিক্ষককে ডেকে পাঠালেন তার দরবারে। শিক্ষক ভাবলেন, যেহেতু তিনি তার পুত্র রাজকুমারকে দিয়ে পানি ঢালিয়েছেন তাই বাদশা তাকে শাস্তি দেবেন। কিন্তু বাদশা তাকে বললেন, তিনি তার পুত্রকে প্রকৃত শিক্ষা দিতে পারেননি। প্রকৃত শিক্ষা দিলে আজ তার পুত্র শুধু পানি ঢেলে দিত না, নিজ হাতে গুরুর পা ধুয়ে দিত। শিক্ষক বাদশাহর কথা শুনে আপ্লুত হলেন।

আগেকার দিনে এমনিভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমাজের সর্বত্র শিক্ষকদের মর্যাদা দেওয়া হত। এখন সেটা একবারেই নেই। এজন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও হয়ত কিছুটা দায়ী। কিছু কিছু শিক্ষক ক্লাসে পড়ানো ফাঁকি দিয়ে টিউশনিসহ ব্যাচ কোচিং করান। কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অনৈতিক কাজে জড়িত। অর্থনৈতিক বা সামাজিক নানা কারণে শিক্ষকদের এই অধঃপতন। তবে গুটি কয়েক শিক্ষকের জন্য আজ পুরো শিক্ষক সমাজ মর্যাদাহীন হয়ে পড়েছেন। চারিদিকে যা ঘটছে তা দেখে একজন শিক্ষক হিসেবে আমিও লজ্জিত ও ব্যথিত। জানিনা কিভাবে আবার শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার হবে। কিভাবে আবার রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র তাদের সম্মানের চোখে দেখা হবে। তবে যেভাবেই হোক শিক্ষকের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার উপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

লেখক : সন্তোষ দাস
প্রভাষক, সরকারি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা ডিগ্রি কলেজ
ফকিরহাট, বাগেরহাট
ই-মেইল : santoshlipi71@gmail.com

Related Posts